বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশনের প্রাথমিক উদ্দেশ্য হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার সমন্বয়, নিয়ন্ত্রণ, পরিচালনা এবং বিকাশ ঘটানো। এই প্রতিষ্ঠানের দায়িত্ব হলো বিশ্ববিদ্যালয়ে উচ্চশিক্ষার মান রক্ষা এবং নিয়ন্ত্রণ।আবার বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরী কমিশন সরকারকে উচ্চশিক্ষার সামগ্রিক বিষয়ে পরামর্শ দিয়ে থাকে। উচ্চশিক্ষার নীতিমালা এবং আন্তর্জাতিক মানে পৌঁছানোর লক্ষ্যে মান নিশ্চিতকরণ সংক্রান্ত নীতিমালা প্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী সরকারকে পরামর্শ প্রদান করাও প্রতিষ্ঠানাটির অন্যতম কাজ। উপরোক্ত কাজগুলো ইউজিসি কতটুকু সুষ্ঠুভাবে করতে পারছে, তা নিয়ে রয়েছে নানা প্রশ্ন।শিক্ষাবিদরা মনে করেন, ইউজিসি ‘ঠুঁটো জগন্নাথ’। জনবল ও প্রশাসনিক সক্ষমতার অভাবের কারণে ইউজিসি অনেক ক্ষেত্রেই শক্ত ভূমিকা রাখতে পারে না। ইউজিসির ভুমিকা, দায়িত্ব, সক্ষমতা, চ্যালেঞ্জ নিয়ে অনেক অনেক কথা পত্রপত্রিকায় আলোচনা করা হয়েছে বা রয়েছে। ইউজিসির পূর্ণাঙ্গ ভুমিকা না রাখতে পারার অন্যতম কারণ হলো অপর্যাপ্ত জনবল। অপর্যাপ্ত জনবলের বিষয়ে সার্বিক দিক বিবেচনায় আমার অভিজ্ঞতা লব্ধ জ্ঞান থেকে আমি একটি প্রস্তাব পেশ করছি- তা হলো প্রত্যেকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের জন্য বিশেষ করে বেসরকারী বিশ্ববিদ্যালয়ে ইউজিসি একজন স্থায়ী প্রতিনিধি নিয়োগ দিতে পারে।
প্রতিনিধিগণ বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি কক্ষে অফিস করবেন এবং বিশ্ববিদ্যালয় কাছাকাছি পরিবার নিয়ে অবস্থান করতে পারবেন। তাদের সাধারণ দায়িত্ব হবে বিশ্ববিদ্যালয় ও ইউজিসির সমন্বয় সাধন করা। প্রতিনিধিগণ এমন মর্যাদাসম্পন্ন পদের হবেন যাতে বিশ্ববিদ্যালয়কে সরাসরি তদারকী করতে পারেন।এরা যাতে বিশ্ববিদ্যালয় সংশ্লিষ্টদের দ্বারা প্রভাবিত হওয়ার সুযোগ না পান এজন্য মেয়াদ ও বেতন নির্ধারিত হবে বিবেচনা প্রসুত। বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে প্রতিনিধির বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হলেও এদের সিদ্ধান্তের পুর্নবিবেচনার করার ক্ষমতা থাকবে একমাত্র ইউজিসির হাতে। তাদের বেতনভাতার প্রদানের বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয় অর্থ প্রদান করবে অথবা ইউজিসিও থেকেও বিভিন্ন সুবিধা দেয়া যেতে পারে। ইউজিসি প্রতিনিধি ইউজিসির মানব সম্পদ হিসেবে পরিগণিত হবে। ইউজিসি জনবলের সংকটে যে সকল উদ্যোগগুলো বাস্তবায়ন করতে পারেনা তা প্রতিনিধিগণের দ্বারা সম্ভব হবে আমি মনে করি।দেশের সকল প্রতিনিধিগণের অংশগ্রহণে বছরে একটি বা দুটি সভা হবে ইউজিসিতে। এ সভায় প্রতিনিধিদের থেকে প্রাপ্ত অভিজ্ঞতা, তথ্য উপাত্ত দেশের শিক্ষা ব্যবস্থা বাস্তবসম্মত করতে ব্যাপক প্রভাব ফেলবে।
প্রতিনিধির অফিস শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য মতামত অভিযোগ গ্রহণ করতে পারবেন, সেই সাথে একটা বিরোধ নিস্পত্তি ভুমিকা রাখার ক্ষমতাও তাকে দেয়া যেতে পারে কিনা এটা ভেবে দেখা যেতে পারে। শিক্ষক, কর্মকর্তা, কর্মচারী বা শিক্ষার্থীগণ অন্যায্যতার শিকার হলে ইউজিসিতে আবেদন করলে স্বাভাবিক কারণে দীর্ঘসুত্রিতার শিকার হতে হয়। ইউজিসির প্রতিনিধিগণ এসব অভিযোগের সরেজমিন তদন্তর দায়িত্ব পালন করলে ইউজিসির সরেজমিন তদন্তের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় খরচ ও সময় বাঁচবে।
ইউজিসি ও শিক্ষা মন্ত্রনালয় সময়ে সময়ে বিধিবদ্ধ ফরমের মাধ্যমে বিভিন্ন তথ্য উপাত্ত নিয়ে শিক্ষাকে বিশ্লেষণ ও শিক্ষানীতি প্রণয়ন করে থাকে।বিধিবদ্ধ ফরমের তথ্য উপাত্তর বাইরেও অনেক অনেক রকম পারিপার্শ্বিকতা থাকে সেগুলোও বিশ্লেষণ করা দরকার, বিধিবদ্ধ নিয়মের বাইরেও বিশ্ববিদ্যালয়ে এমন কিছু ঘটে যা শিক্ষার যথাযথ বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করে আবার এমন ধরণের বৈষম্য বা অনাচার বিরাজ করে যেসব এখন পর্যন্ত কোন পত্রপত্রিকায়ও আসেনি। একজন প্রতিনিধি এসব নেতিবাচক বিষয় সরাসরি পর্যবেক্ষণ করে সিদ্ধান্ত দিতে পারবেন আবার প্রতিবেদন তৈরী করে ইউজিজিতে পাঠাতে পারবেন।
অনেক বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নিজস্ব যে সকল মিটিং সিদ্ধান্তগুলো হয় শিক্ষার মানের চেয়ে বেশি গুরুত্বপায় বিশ্ববিদ্যালয়ের আর্থিক লাভের বিষয়টি। ইউজিসির প্রতিনিধিগণ সভায় উপস্থিত থেকে সিদ্ধান্ত গ্রহণে ইতিবাচক প্রভাবক হিসেবে কাজ করতে পারেন। একজন প্রতিনিধি ইউজিসি বা শিক্ষা মন্ত্রনালয়ের নির্দেশনা সমুহ বাস্তবায়ন ও পরিপালনে ভুমিকা রাখতে পারবেন আবার এসব নির্দেশনার বাস্তবিক অভিজ্ঞতা ইউজিসিকে জানাতে পারবেন। এমনটি করা হলে আইন বা শিক্ষার্থী বিরোধী যে সকল কর্মকান্ডগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘটে থাকে তা কমে আসবে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে মহামান্য রাষ্ট্রপতি কর্তৃক নিয়োগপ্রাপ্ত উপাচার্য, উপ-উপাচার্য বা ট্রেজারার গণের সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষেত্রে ইউজিসি প্রতিনিধিগণের ভুমিকা কখনও কখনও হতে পারে প্রভাবক হিসেবে। যেসব বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সরাসরি তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হয় সেখানকার সার্বিক অবস্থা একরকম আর প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের প্রতিনিধি কর্তৃক পরিচালিত হয় তেমন বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক অবস্থা ভিন্ন। এক্ষেত্রেও একজন ইউজিসি প্রতিনিধি শিক্ষাবান্ধব পরিবেশ বজায় ভুমিকা রাখতে পারবেন।
ইউজিসির বিধিবদ্ধ আইন কানুনের আওতার বাইরেও গুণগত শিক্ষা নিশ্চিতের অনেক উপাদান বিশ্ববিদ্যালয়ে আছে সেটা দুর থেকে অনুধাবন করা সম্ভব নয়, বিশ্ববিদ্যালয় গুলো যেসব রিপোর্ট প্রদান করে তা বিশ্লেষণ করে বের করা সম্ভব নয়। ঢাকার মতিঝিলে অবস্থিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বরুপ গঠণ প্রকৃতি ও টিকে থাকার সক্ষমতার সাথে প্রত্যন্ত অঞ্চল মধুপুরে অবস্থিত একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বরুপ এক নয়। বিশ্ববিদ্যালয় কোন কোন সময় তার নিজের তৈরী করা আইনকেও এড়িয়ে চলে। তাই নিজ নিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে অবস্থিত ইউজিসি প্রতিনিধির অফিস বাস্তব সম্মত পরিচালন নীতি বাস্তবায়ন করতে পারবে।
উপরোল্লিখিত বিষয়গুলো শিক্ষাবিদ ও শিক্ষার নীতি নির্ধারকগণের সুবিবেচনায় এনে বাস্তবরুপ দিতে পারলে একজন ইউজিসি প্রতিনিধি বিশ্ববিদ্যালয়ে সরাসরি অবস্থান করে অর্জিত অভিজ্ঞতা দেশের শিক্ষা নীতি প্রণয়ন, পরিচালন, পরিপালনে অনন্য ভুমিকা রাখতে পারবেন বলে আমি মনে করি।
লেখক: অফিস অ্যাসিস্ট্যান্ট, জেড. এইচ. সিকদার বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, ভেদরগঞ্জ, শরীয়তপুর।
লেখাটি দৈনিক নিরপেক্ষ পত্রিকায় প্রকাশিত






